বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৬

সাজিদুল হক-এর : নাটোরের মির্জাকন্যা : শেখর দেব

শুক্রবার, ১ মে ২০১৫

কবিতার আছে অন্তর্গত মগ্নতা। নিবিড় বেদনার তীব্র অনুভূতির মতো কবিতা কবির মননকে অস্থির করে তোলে। মননের চিন্তা প্রক্রিয়ার ভেতর যাপন ও চেতনার যুগপৎ ক্রিয়াশীলতায় কবিতার জন্ম হয়। কবিতা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট শিল্প মাধ্যম। একজন কবির থাকে সুদূর ও নিবিষ্ট চিন্তা করার ক্ষমতা। সেই চিন্তার সাথে অভিজ্ঞতালব্ধ চেতনার সংমিশ্রণে কবি কবিতার বিষয় খুঁজে পান। হয়তো বিষয়হীনতার মাঝেই ফোটান কোনো অমোঘ বিষয়। কবিতা বিষয় ও ভাব ধারণের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেন প্রার্থিত দর্শন। দর্শনহীন সাহিত্য ভিত্তিহীন। মানুষের মনে দর্শনের জন্ম হয় স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য আর চেতনাগত উন্মেষের মধ্যে দিয়ে। স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য সে উত্তরাধিকার সূত্রে যাপিত জীবন থেকে অর্জন করে আর চেতনাগত উন্মেষ ঘটে লব্ধ জ্ঞান ও যাপনের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে। একজন কবিকে শুধু যাপনকারী হলে হয় না তাকে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে যাপিত জীবনের অনুপুঙ্খ বিচার করে নির্দিষ্ট দর্শনে দাঁড়াতে হয়। দাঁড়ানোর বিষয়টা যার যতোটা নড়বড়ে সে ততোটা ব্যর্থ। কবিতার আছে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অপরিমেয় শক্তি। সেই শক্তির উদ্ভাস না হলে কবিতা আক্ষরিকভাবে বা সাহিত্যগত দিক হতে যতই কবিতা হউক না কেন তা আর ভালো কবিতা হয় না। ভালো কবিতা বললে মনে হয় খারাপ কবিতাও হয়। যে কবিতা একটুও মনে লাগে না সেটাই খারাপ কবিতা? কবিতার আসলে ভালো আর খারাপ কোনো রকমফের নেই। যে কবিতা সময়ের চাহিদা মেটায়, ভবিষ্যতে এর মূল্য থাকে না সেটা কবিতা হয়েও যেন কবিতা না। অর্থাৎ কবিতাকে কালোত্তীর্ণ হতে হয়। কিভাবে কবিতা কালকে অতিক্রম করে সর্বকালে তার রস-গুণ ধরে রাখে সেটা কবিতাই বলতে পারে। কবির হাতে এক ধরনের জাদু আছে। সেই জাদুই সেটা কবিকে দিয়ে করিয়ে নেয়। তবে এ জাদুতে অলৌকিক কিছুর সংশ্লিষ্টতা নেই। একজন কবি সেটা নিজে থেকেই আয়ত্ত করে নেয়।

গেল শতকের আশির দশক হতে কবিতার নির্মোহ অন্তরে কবি সাজিদুল হকের নিঃশব্দ বিচরণ। কবি কবিতার কোমল শরীরের শিরা-উপশিরায় সঞ্চালিত করে চলেছেন শেকড়-সঞ্জাত দ্রোহের রঙ। নব্বই দশকে চট্টগ্রামের সবুজ হোটেল হতে উত্তর আধুনিক সাহিত্য আন্দোলনের এক জন মেধাবী অংশীদার তিনি। তাঁর কবিতায় মিশে আছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিবিড় চেতনার সাথে বিশ্ব বিক্ষণের এক সুন্দর প্রয়াস। কবিতায় ব্যক্তিগত চেতনার রঙে মিশিয়ে দেন সামষ্টিক মনন। জীবনবোধের অন্তর্গত বিশ্লেষণে তুলে আনেন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবিধ অনুষঙ্গ। কর্পোরেট বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাজার সংস্কৃতির বিবিধ ঘাত-প্রতিঘাত কবিতায় প্রাণ দিয়েছেন দক্ষতার সাথে। বিনির্মাণের নীরব অথচ প্রবল ইচ্ছা কবিতার পঙ্ক্তিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। কবিতার সাবলীল বয়ানের মাঝে গভীর বোধকে নাড়া দেয়ার শক্তি কবিকে করেছে আলাদা। পূর্বে কবি ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’য় জীবনানন্দেও সুরঞ্জনাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। ‘নাটোরের মির্জাকন্যা’ কবিতাগ্রন্থে কবি জীবনানন্দের প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে আমাদের সামনে তাঁর মননের ডানা মেলে ধরেন। বনলতা সেনকে জাদুকরি মুগ্ধতার মধ্যে নিয়ে আসেন অন্ধকার হতে আলোর বাস্তবতায়। অনায়াসে বলে দেন, ‘জীবনানন্দ, তোমার বনলতা সেন কখনো ছিল না’। কবি ‘মেধাবী পিয়ানো বাদক’-এর মতো সুর তোলেন যুগপৎ প্রেম ও দ্রোহের। বনলতা সেন হয়ে ওঠেন নাটোরের মির্জাকন্যা। নারীর বিচিত্র যাপন ও দহনের অনুভূতিকে ধারণ করেছেন প্রেমিক মেধায়। কবির চিত্রিত কন্যারা আমাদের প্রতিবেশী। তিনি কল্পিত আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর অনিহা থেকে বনলতাকে বলেন, ‘কল্পনার বসন ছেড়ে এসো বনলতা, তুমি মানবীয় হও!’ নগরের করাল যাপনের ভেতর দিয়ে কবির মনে ধারণ করে রাখেন মাটির গন্ধ। কবি বলেন,‘আমরা প্রকৃতির সন্তান; শরীরে মেখেছি মাটির গন্ধ’।

কবির প্রেমিক মন নারীকে বিভিন্নভাবে আবিষ্কার করেছেন নিজের মননে। কবির নারীরা সম্পর্কের জটিল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যেন ঠিক প্রেমিকা হয়ে ওঠেন। কবির পরশে যেন বাগানের কলিরা ফুল হয়ে গেল অথবা ফুলগুলো যেন কবিকে শিখিয়ে গেল প্রেমগন্ধ বা কামগন্ধের মাত্রা। মাঝে মাঝে কবি প্রেমিকার ধ্যান করেন নিবিড় মগ্নতায়। তাই ‘সুজাতাকে কখনো’ না দেখে কবি ‘সুজাতার ধ্যান’ করে। স্বপ্নের সেই সুজাতা ‘সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালিয়ে হারিয়ে যায় অদৃশ্য কোথাও ঠিকানা না রেখে’। কবি সেই সুজতা যেন কবির আরেক নায়িকা ‘কাবেরী’ অথবা ‘বয়ঃসন্ধির নিলুফা’। তাই কবি জীবনানন্দের সুরঞ্জনার সাথে দেখা হলে তাকেও নিলুফার কথা বলেন। কখনো কবি ‘অবেলার যাত্রী’ হয়ে ‘চিনু ফুফুর বুকের উঠোনে’ খুঁজেন ‘নিঃসঙ্গ অন্ধকার’। এ কাব্যে কবির যাপিত জীবনে প্রভাব বিস্তার করা নারীদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন তাদের দুঃখ, বেদনা, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা এবং এসবের ওপর পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব। কবির বেশির ভাগ কবিতায় তা বেশ স্পষ্ট।

মির্জাকন্যার কবি জীবনানন্দকে বিভিন্নভাবে বিনির্মাণ করেছেন সমেধায়। নাটোরের অশরীরী বনলতাকে বানিয়েছেন মির্জাকন্যা। এই মির্জাকন্যা হতে পারতো কবির নিগূঢ় প্রেম কিন্তু সে হয়েছে কর্পোরেট পণ্য। কবির কিছু কবিতাংশের দিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
১. উদ্বাস্তু স্বপ্নের নাবিক তুচ্ছ জীবনের অভিজ্ঞতায় বলে

জীবনানন্দ, তোমার বনলতা সেন কখনো ছিল না

নাটোরের জনপদে; আকাশের শূন্যতায় কিংবা

কাল্পনিক অবয়বে এতোকাল যে ছিলো স্বপ্নচারিণী

আমাদের দিয়েছে নক্ষত্রের অন্ধকার। বিষাদের বিদর্ভ

নগরে নামে নিঃসঙ্গ আত্মার গোধূলি। নির্জনতায়

পিতলের অক্ষরে বুনন শ্রাবস্তির গোপন অসুখ।

(নাটোরের মির্জাকন্যা)
২. ঈশ্বরের অন্তর্গত অসুখ নিঠুয়া সোহাগ

বাজারের উষ্ণতায় বেশ আছ বহুজাতিক গর্ভে

অচেনা মনে হবে সুন্দরী নিসর্গ।

(নিঠুয়া মুদ্রার সোহাগ)
৩. ক্ষণকাল তাদের প্রতিশ্রæতিময় স্বপ্নগুলো

দেখে না নিদ্রিত নক্ষত্রের ক্রন্দনে

স্বপ্ন কতটা পথ চলে ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত পাখির

ডানায়। আরণ্যক ব্যস্ততায় দেখা হয়েছিল

সুরঞ্জনার সাথে, তাকে বলেছি নিলুফার কথা।

(প্রাচীন মুদ্রায় কেনা শহর)
উপরের কবিতাংশ হতে কবির বইটি সম্পর্কে সহজে ধারণা পাওয়া যায়। প্রতিটি কবিতাংশ নিয়ে আমি ব্যাখ্যা নাইবা করলাম। তুবুও কিছু উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট উল্লেখ না করলেই নয়। কবি এ কাব্যে যে বিষয়গুলোর প্রতি আলোকপাত করেছেন তা হলো : প্রথমত, মির্জাকন্যার কবি সাজিদুল হক জীবনানন্দের নারীদের ধরতে চেয়েছেন কঠিন বাস্তবতার নিরিখে। আর মায়াবী বা অদৃশ্য জগৎ হতে নিয়ে এসেছেন আমাদের যাপিত জীবনের কাছাকাছি। দ্বিতীয়ত, বহুজাগতিক বাজার সংস্কৃতিতে পণ্য হয়ে যাওয়া আমাদের রমনীয় সৌন্দর্য ক্রমশ ভুলতে বসেছে নিজেদের মহিমা। তৃতীয়ত, প্রগাঢ় মৃত্যু কল্পনার ভেতর যাপিত স্বপ্নের সুমূল্যায়ন। চতুর্থত, কর্পোরেট চাকচিক্যে লাবণ্য হারানো স্বাভাবিক জীবন যাত্রা। এই চারটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে কবির আলোচিত কাব্যে। এ ছাড়াও কবির প্রেমের বহুরৈখিক বিশ্লেষণ লক্ষ করার মতো।

কবি সাজিদুল হকের ‘নাটোরের মির্জাকন্যা’ কবিতাগ্রন্থটি একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৫-এ প্রকাশ করেছে ‘শাঁখ’ প্রকাশন। ৫৬ পৃষ্ঠার বইটিতে কবিতা আছে ৪৮টি। বইটির দাম রাখা হয়েছে ১৪০ টাকা। বইটি বাতিঘর, নন্দনসহ বিভিন্ন বইবিপণিতে পাওয়া যাবে। তাছাড়াও অনলাইনে ক্রয় করা যাবে রকমারি ডট কম হতে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন