বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৬

কবিতার চিন্তা ও চেতনা

শেখর দেব
http://www.fns24.com/details.php?nssl=c1537c9ed39baee3476c6fdd666b5fd8&nttl=1407201534126#.Vvzeh3qeXIV14 Jul 2015   09:20:07 PM   Tuesday BdST A- A A+
 কবিতার চিন্তা ও চেতনা
কবির চিন্তা ও চেতনার গভীরতা কবিতার রসদ। মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। চিন্তার স্বাভাবিক প্রবণতা কবিকে কাব্য শরীর দাঁড় করাতে সাহায্য করে। চেতনা চিন্তাকে পরিশীলিত করে। সম্যক জ্ঞান কবিতায় আনে সুনির্দিষ্ট বার্তা। এ বার্তা প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত বার্তা নয়। যেহেতু কবিতার ভাষা মন ও মননের সংমিশ্রণ, এর বার্তাও একান্ত মনো-মননগত। এ বার্তা মানুষের মনের উৎকৃষ্ট অনুভূতি ও মননের চেতনাগত বার্তা। উদ্দেশ্যহীন মনোভাষা আবেগতাড়িত কবিতার জন্ম দেয়। তাই মনন দিয়ে মনকে পরিশীলিত করতে হয়। মনের চিন্তাগুলো ভাষা হবার আগে চেতনায় পরিশুদ্ধ হলে কবিতা হয়। অন্যথায় মনের ভাষা ও মুখের ভাষা এক হয়ে যায়। অবশ্য মুখের ভাষা মস্তিষ্ক ও মনের চিন্তা প্রসূত। তাহলে মনের ভাষা ও মুখের ভাষায় পার্থক্য কই? পার্থক্য আছে। আছে বলেই মাঝে মাঝে মনের কথা ঠিক প্রকাশ করে উঠতে পারি না। আমরা নির্বাক হই, ভাষাহীন হই। তাই কবিতা মনন বিশ্লেষিত মনের ভাষা। এখানেই কবিতা ও কথাসাহিত্যে পার্থক্য। কবিতা যদি মুখের ভাষা হয়ে যায় তা শীল্পমূল্য হারায়। কবির আবেগ কবিকে সমৃদ্ধ করে যেমন ডুবায়ও তেমন। আবেগের পরিশীলন না হলে কবিতা উর্ত্তীন্ন হয় না। আবেগ বর্ষার জমাট বাঁধা কালো মেঘের মতো। তার একটাই ফল তুমুল ঝরে যাওয়া, চরাচর ভাসানো। কিন্তু বৈশাখের মেঘ অনেক রহস্যজনক। এখন কালো হয়ে এলো আবার এখন ফর্সা হয়ে আসছে। এখন ঢেকে দিল নীল আকাশ, আবার সমহিমায় হাজির। এর মধ্যে একটা ধাঁধা আছে। এটাই কবিতা। তাই কাঁচা আবেগ কবিতাকে বর্ষার মেঘের মতো ভারী করে তোলে, যার ফল সুনিশ্চিত। তাই আবেগের পরিশীলন জরুরী। চিন্তায় আবেগ থাকে, তাই চেতনার দরকার হয়। কবির এমন কোন দায় নেই কবিতায় একটি নির্দিষ্ট বিষয় বোঝাতে হবে। বোঝাতে গেলেই  কবি কাব্য মঞ্চে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কবির চিন্তা ও চেতনার সমন্বয়ে কবিতা হয়। বোঝার দায়িত্ব পাঠকের। না বুঝলেও তেমন ক্ষতি নেই কারণ আগেই বলেছি কবিতার ভাষা মনের ভাষা। তাই মনের ভাষা সবসময় বুঝতে হবে এমন কথা নেই। আমরা কজন নিজের মনকে বুঝি? আবার অন্যের মন! তবে অনুভূতির একটা মজা আছে। অনুভূতির মজা মুখে বলে প্রকাশ যোগ্য হয়ে ওঠে কম। অনুভূতির কথা অনুভবের ব্যাপার। এই অনুভবের জন্য চাই স্থির মন। অস্থিরতা কবি ও কবিতা দুটোকে নষ্ট করে। ঠিক তেমনে পাঠকের ক্ষেত্রেও সত্যি। তাই একই কবিতা পাঠকবেধে মূল্যায়নের ভিন্নতা দেখা যায়। পাঠকের মানসিক উচ্চতা কব্যপাঠে সাহায্য করে। মানসিক উচ্চতা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে না গেলে কবিতা দুর্বোধ্যই থেকে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই কাব্য পাঠে যোগ্যতার প্রশ্ন আসে। শিল্প আজীবন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষকেই আনন্দ দিয়েছে এবং দিবে। সাহিত্যের উৎকৃষ্ট শিল্প হলো কবিতা। পাঠকের চিন্তার জগত তার চেতনার চেয়ে বেশি নয় কিন্তু কবির চিন্তার জগত তাঁর চেতনার চেয়ে বেশি, এটা কবির স্বভাবগত। এজন্যই একজন কবি, কবি হয়ে ওঠেন। চিন্তা মানুষের স্বভাবগত বিধায় তা সাধারণত দৃশ্যগোচর বস্তু দর্র্শনে সৃষ্টি হয়। তার পজেটিভ ও নেগেটিভ দুটো দিকই আছে। তবে চেতনার পজেটিভ ছাড়া নেগেটিভ কোন দিক আছে বলে মনে হয় না। চিন্তার জন্ম চোখ থেকে আর চেতনার জন্ম মন থেকে। এটা বলা যায় বর্হিদৃষ্টি ও অর্ন্তদৃষ্টির সমন্বয় হলে একজন মানুষ ভালো মানুষ হয় তার কাজে ও কর্মে। কবি মাত্রই ভালো মানুষ কারণ সে কবিতা লেখে। অবশ্য সাধু কবিদের ফাঁকে আজকাল অসাধু কবিও দেখা যায়। সাধু কবি তার চারপাশের পরিবেশের কাছে দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতার মধ্যে কবি মুক্তি খুঁজে পান। সেই মুক্তি বিন্দুমাত্র সেচ্ছাচারিতা নয়, কবির অবাধ বিচরণ। কবির সমগ্র সত্ত্বায় গেঁথে আছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মাঝে। অসাধু কবি আসলে কবি নয় অসাধু। তারা আসলে ধ্যান ভ্রষ্ট বা সাধনভ্রষ্ট সাধু। তারা সাধুর ভান ধরে আছে। তাই মানুষ মাত্রই কবি নয় আর কবি মাত্রই সাধু কবি নয়।
কবিতার নির্দিষ্ট কাঠামো আছে, এ যেমন সত্যি, সেই কাঠামো ভেঙে দিয়েও কবিতার ক্যানভাস রঙিন করে তোলা যায় শব্দ ও ভাবের সুষম সমন্বয়ে। শব্দের শক্তি সম্পর্কে অবগত হওয়া একজন কবির বেশ প্রয়োজন। কবিতার বড়ো পরিসর গ্রহণে খুব অনিহা। তাই ছোট ক্যানভাসে কবিকে কবিতা ফোটাতে হয় যতনের সাথে। যাকে আবার কবিতাও হতে হয়। শব্দ যুগপৎ দৃশ্য ও ভাবের জন্ম দেয়। শব্দের মধ্যে দৃশ্য খুব সহজে ধরা দিলেও ভাবের ক্ষেত্রে তেমনটি না। একটি শব্দ পুরো একটি ভাবকে ধারণ করতে পারে না। শব্দের সাথে শব্দের বন্ধুত্ব না হলে ভাব মাঠে মারা যায়। কবি পাঠককে কবিতার ভেতরে প্রবেশ করাতে ব্যর্থ হয়। তাই কবিতায় কবির ভাব সুস্পষ্ট করতে হলে শব্দের গাঁথুনি হতে হয় যুৎসই। শব্দের পরশে শব্দের অর্থগত পরিবর্তন ঘটে। যা তার শাব্দিক অর্থকে ছাড়িয়ে যায়। উপহার দেয় নতুন কিছু। এখানেই কবির সার্থকতা। কবির অর্ন্তজগতে প্রতিটি শব্দ জোনাকি হয়ে জ্বলে যা বর্হিজগতের সাথে সঙ্গতি সুসংহত করে তোলে। মাঝে মাঝে শব্দে শব্দে গড়ে ওঠে ধাঁধা। কবিতার ভাবে লাগে বহুরৈখিকতার পরশ। কবিতার ভাবের বিভিন্নতা কবিতাকে রহস্যময় করে তোলে। কবিতার এ রহস্য চিরন্তন। স্বভাবগতভাবে কবি এ রহস্যের খেলা রপ্ত করেন। কবি খুব সহজ কথায় অনেক মূল্যবান ভাব প্রকাশ করতে পারে। মূল্যবান মানে সৌন্দর্যের মূল্য। যা একান্তই মনোগত ব্যাপার, উপলব্ধি করতে পারলে ভালো লাগা কাজ করে। ভালো না লাগলে কবিতা ব্যর্থ হয়, সাথে কবিও। শব্দের সুষম সমন্বয় কবিতাকে ফুটিয়ে তোলে ভোরের সূর্যমুখীর মতো আবার শব্দের বাহুল্য বা অসমন্বয় কবিতাকে ডোবায়। অপ্রয়োজনীয় শব্দ কবিতাকে মেদবহুল করে, কবির আবেগ কবিকে এই ভুল করিয়ে নেয়। তাই আবেগের পরিশীলন জরুরী।
কলম খাতার কাছে আসলেই বা কিবোর্ড আর মনিটর সামনে থাকলেই কবিতা হয় না, হয় কথা। শুধু কবির কলম ও খাতা বা কিবোর্ড আর মনিটর সামনে থাকলেই কবিতার জন্ম হয়। কবি মানুষের অভিন্ন কিন্তু চিন্তা ও তার রূপায়নে ভিন্ন। দৃশ্যমান সবকিছু কবি অন্য দশজনের মতো দেখে এবং বোঝে কিন্তু একজন কবি তা কালিতে চমক দিতে পারে বলে সে কবি। কবির মানসিক সত্তা ও সামাজিক সত্তার মিল অমিলের কারণে কবিতা আসে। কবিতা হয়ে যাওয়ার বিষয়। মূলত কবিতা শব্দ ও ভাবের অনুপম কলা। সেই কবিতার সাথে সামান্যতম কৌশল কবিতাকে দিতে পারে অন্য মাত্রা। তবে কবিতা কি কৌশল? উত্তরঃ না। তবে কবিতায় কিয়দাংশ কৌশল প্রয়জোন পড়ে। কবির দৃশ্যগত বা চিন্তাগত বা দর্শনগত পীড়ন সবসময় কাজ করে। এসবের সমন্বয়ে একটি ভাব  তৈরি হয় যা শব্দের ডানায় চড়ে ক্রমাগত কবিতার আকাশে উড়ে যেতে চায়। জন্ম হয় কবিতার। এ পুরো প্রক্রিয়ায় আবেগের সংযোগ বা বর্জনের, শব্দের দন্ধের বা বন্ধুত্বের, ভাবের সৌন্দর্যের বা ব্যর্থতার কৌশলে আবর্তিত হয়। কাব্য উদ্দীপনার পরের ব্যাপারটি কৌশল। কাব্য কৌশল। এ জন্য কবিতা কল্পনামূলক শব্দ গ্রহণ করে। যে শব্দে রয়েছে যুগপৎ ভাবের রহস্য ও সৌন্দর্যের ঝিলিক।
ছন্দ শব্দকে সুগঠিত করে, কবিতাকে দেয় একটি ফর্ম। কবির মনে একধরনের সুর কাজ করে। এ গানের সুরের মতো নয় য্যান ঠিক। কবিতার সুর। কবিতায় এ সুর ধ্বনিত হয় শব্দে শব্দে। এ সুরই কবিতার ছন্দ। একজন কবি মেপে মেপে নয়, প্রকৃতিগতভাবেই এটা রপ্ত করেন। যদি অন্তরে সুর খেলা করে, কবিতায় ছন্দ আসবেই। কবিতায় থাকবে চিত্রকল্প বা কল্পচিত্র। শব্দের সহজ সমন্বয়ে যা গড়ে ওঠে। এ চিত্র একান্তই কবির আশেপাশে ছড়িয়ে  আছে। কবিতায় তা ধরার জন্য চাই সহজিয়া মন ও মনন। খুব সাধারণ চিত্র কল্পনায় ফুটিয়ে তোলা যায় অসাধারণ করে। এ ক্ষেত্রেও কবিকে সেই চিত্রকে ফোটানোর জন্য যুৎসই শব্দের সমন্বয় জরুরী হয়ে ওঠে। কবি তা পারে। কবির অদ্ভুত এ ক্ষমতাটি রয়েছে। না বলা কথা সে বলে দেয়, না বোঝা কথা সে বুঝিয়ে দেয়।
শব্দমেদ যেমন কবিতাকে কাব্যরসহীন করে ঠিক তেমনি ভাবের বিচ্ছিন্নতার মাঝে কবি শৃঙ্খলা তৈরির মুন্সিয়ানা দেখাতে পারলে কবিতা সার্থকও হয়ে ওঠতে পারে। তবে তা কবির কাব্যশক্তিতে নিহিত। কাব্যশাসন কবিতাকে নিরোগ করে। কবিতাকে বাঁচায় বিচ্ছিন্নতার বলি হতে। কবির কাছে শব্দ ফুলের মতো। যার আছে সৌন্দর্য ও কোমলতা। কবির সুন্দর চেতনা জরুরী। কবিতা শিল্পটাই মূলত সুন্দরের শীল্প। এ শিল্প কবির ভাষাবোধকে সমৃদ্ধ করে।
কবিতে সময় সচেতন হতে হয়। কবিতায় সময়কে ধারণ করতে না পারলে কবি ব্যর্থ। এই ধারণের ব্যাপারটি হতে পারে কবিতার বিষয়, আঙ্গিক ভঙ্গি এসবের সমকালিন প্রবণতাকে ধারণ। কবির একটি দেশ থাকে। যে দেশের আলো বাতাসে সে বেড়ে ওঠে। যার মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শিখে। আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, বর্ণিল সংস্কৃতি। একজন কবি এর সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, খোঁজেন সংগতি আর অসংগতি। কবিতা এ সবের প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে সুপ্রাচীন।‘চর্যাপদ’ হতে বাংলা কবিতার যাত্রা। চর্যাপদের সময়  হতে এ  পর্যন্ত রাশি রাশি কবিতা রচিত হয়েছে শত শত কবির হাতে। আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনাকে ধরতে হলে কবিকে সাঁতার দিতে হবে এ কাব্য সমুুদ্রে। বুঝে নিতে হবে কবিতার বাঁক ও প্রবণতা। প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পুঁজি করে সমকালিনতার উপর ভর করেই কবিতাকে অনন্তের মুখ দেখাতে হয়। শেকড়জাত বিষয়গুলো কবিতায় নিয়ে আসার আলাদা কোন কৌশল নেই। কবিকে এ ব্যাপারে কোন অত্যধিক প্রচেষ্টারও প্রয়োজন পড়ে না। এ বিষয়গুলো আপনাআপনি আসে কারণ একজন  কবি তাঁর শেকড়ের উপর ভর করেই বেড়ে ওঠে। শেকড়জাত চিন্তনে, ভাষ্যে এসবের চিত্র ফোটে। কবির কাজ শুধু কবিতা লেখা নয়। আর দশজনের মতো তাকেও যাপন করতে হয় সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার জীবন। যাপনের আনন্দ-বেদনা কবিতায় আসে। এসবের মাঝে আমাদের ঐতিহ্য চেতনা সচেতনভাবে ঢোকাতে হয় কবিকে। তাই আমাদের শেকড়জাত বিষয়গুলো নিয়ে পঠন-পাঠন জরুরী। তাই কবিকে পড়তে হয় বেশি লেখার চেয়ে।

ধৃতরাষ্ট্রের দেশে ][ শেখর দেব

http://saatdin.blogspot.com/p/blog-page_3087.html

রক্ত পোড়ার ঝাঁঝালো ঘ্রাণ আর
দেহের বিৰত মাংসের সমান হিংস্র সভ্যতা!
মানুষ কবে মানুষ হবে মধ্যপ্রাচ্যের গুহায়?
পবিত্র শিশুর বাগানে যে ঢালে আগুনের লাভা
সে কী মানুষ হবে না?
পিলে চমকানো যে ছবি ফোটে বোমার হুঙ্কারে
তাতে ধৃতরাষ্ট্রদের চোখের ঠুলি কখনো যাবে না খুলে
মানুষ জাগো
জেগে ওঠো আলো হয়ে অন্ধ রাজাদের চোখে!

সাক্ষাৎকার

অচেনা যাত্রী

 http://achenayatri.blogspot.com/2014/10/blog-post_44.html

পাপড়ি পাপড়ি

চোখের ভেতর জাগে দুর্বিনীত আলো চারিদিকে ঘুরি তীব্র মায়ার মাঝে

গোলাপের ছড়ানো পাপড়ি জোড়া লাগানোর আশায় যতোবার গিয়েছি

তোমার কাছে বর্ণিল হাসিতে উড়িয়ে দিলে আকাশে পাপড়ি মানে

জেনেছি বিনিদ্র রজনীর স্বপ্ন যার রয়েছে দীর্ঘ অনুরাগের গোপন ভাষা

যে ভাষা আজো দ্বিধায় বলা হয়নি ঠিক চিন্তার অবিকল একবার সুন্দর

সফেদ গোলাপ তার সব মায়া নিয়ে শিখিয়েছে ভালোবাসার বিন্দু-বিসর্গ

অপূর্ব ঘোরের মাঝে কেটে গেলে বেলা ভুলে যাই ফুলের অপূর্ব সুরভি

শুধু সমুদ্র বিশাল লোনা লোনা খেলা যতো জেগে ওঠে অপার মহিমায় 

বাঁকে বাঁকে বাজে বাঁশি, সুরের সমাধি আলো তার প্রকট উজ্জ্বল আশা

সমুদ্র মন্থনের পর উঠে আসা যতো সুন্দর তার সব নিয়ে গেলে তুমি

রেখে গেলে শুধু কিছু প্রগাঢ় নীল সেই নীল পানে নীলকণ্ঠ হয়ে বুঝি

আলোর মাত্রা যে আলোয় অন্ধ হয়ে মাতাল মত্ততা নিয়ে থাকি ঘোরে

পৃথিবী অচেনা হয় যদি, তোমারে চিনিতে চিনিতে আবার নীলকণ্ঠ হয়ে

সুরের সিঙ্গায় তুলে আনি সমস্ত গোলাপের পাপড়ি পাপড়ি পাপড়ি শুধু

জানো যদি কতো পাপড়িতে হবে এক সুবোধ গোলাপ বিভেদ ভুলে

একবার বলে যাও হে আলো, তুমি কেন হও কালো বুকের স্নিগ্ধ আবাসে

বৈকালিক সাধনা

বিকেল মানে বেদনা এরূপ ধারনা নিয়ে ঘুম ভাঙার পর

পশ্চিমের রক্তিম আভায় ডুবে যেতে থাকা সূর্যের সাথে

জমে যায় ভাব ব্যথা সেতো গোধূলি বেলার উড়ে যাওয়া বক

বিগত এক গোধূলির বুকে জমে আছে আমাদের নির্মোহ প্রেম

আকাশে বিচ্ছুরিত লালের অবিকল রক্তাভ কপোলে খুঁজেছি

সমস্ত দিনের দর্শন স্বর্গের সুষমা বুঝেছি সেই প্রথম

বাতাসের অন্তর্গত বেদনার ভেতর রাখালের বাঁশির সুরে উড়ে ধূলি

গাঢ় মেঘের ঘুম-চোখ নিয়ে অস্তবেলার স্বপ্নে বিভোর হারিয়ে ফেলি

বৈকালিক বেদনা এখন বিকেল মানে প্রিয়ার সাধনা!

প্রেমসূত্র

বুকে নিরবতার ইতিহাস নিয়ে হাঁটি চরাচরে

চোখ বন্ধ হয়ে আসা শান্তির অনুভূতি যে দিয়েছে

তার কাছে রেখেছি জীবনের আধেক সাধনা

অন্তরের সুরে ভেসে ভেসে শূন্যে মিশে যাবার পাঠশালায়

শিখেছি মৌনজগতের মহাকর্ষ যা নিউটন বুঝেননি তেমন

দেহে দেহে ঘষা লেগে আগুন ধরেছে যেদিন

সেদিন সভ্যতার সোপানে পা রেখে দেখেছি

পাপ আর পবিত্রতার মাঝে রয়েছে নিবিড় যোগসূত্র

নিরবতার আগুনে যে আপেক্ষিকতা লুকানো তার গুণ নিয়ে

ছড়িয়ে দেই ঘোরের সুন্দরে যা আইনস্টাইন বুঝেননি কিছুই

আদিম সুর নিয়ে যেই সভ্যতার দিকে যাই

দেখি প্রেম ছাড়া পৃথিবীর কোন ইতিহাস নেই

সব সূত্র এখানে একসূত্রে গাঁথা--যার নাম প্রেমসূত্র

বাঞ্ছাকল্পতরু’ নিয়ে শেখর দেব

http://dhakareview.org/interveiw-with-shekor/

শেখর দেব 
ঢাকা রিভিউ: ‘বাঞ্ছকল্পতরু’ বই হিসাবে কত নম্বর বই? এর আগের বইগুলোর নাম কি?
উত্তর: এটা আমার দ্বিতীয় কবিতার বই। প্রথম কবিতাগ্রন্থটির নাম ‘প্রত্নচর্চার পাঠশালা’। ২০১৪ সালে পাঠসূত্র প্রকাশন ৪৮টি কবিতা নিয়ে বইটি প্রকাশ করেছিল।
ঢা রি: এই বইয়ে কয়টি কবিতা আছে? কতদিনের প্রস্তুতি?
উত্তর: এই বইয়ে ৫৪টি কবিতা আছে। তিন বছর ধরে লেখা প্রায় ১৫০ প্রকাশিত কবিতা থেকে বাছাই করে বইটি করেছি।
ঢা রি: আমাদের বই শুধু মেলা উপলক্ষে বের হয় কেন? এটা কি ঠিক?
উত্তর: আমাদের দেশে বই মেলা বড়ো উৎসবে পরিণত হয়েছে। সবাই চাই এই উৎসবের শামিল হতে। তাছাড়া বই মেলায় গিয়ে মানুষ বই কেনে। তাই হয়তো বই মেলে উপলক্ষে সবাই বই বের করতে চায়। ঠিক বেঠিকের প্রশ্ন নয় বরং বই প্রকাশিত হচ্ছে এটা একটা বড়ো ব্যপার। সব লেখকরা এক ধরনের চর্চার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এটাই পজেটিভ।
ঢা.রি: একটা বইয়ের থিম কিন্তু তার শিরোনাম।আপনার শিরোনাম কিভাবে দেওয়া।
উত্তর: আমার বইয়ের শিরোনাম ‘বাঞ্ছাকল্পতরু’। মূলত পৌরাণিক মিথ থেকে এ নাম নেয়া। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মাটিলগ্ন বিষয়গুলোর সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক মিথগুলো মিলে মিশে আছে। মিথের প্রতি তীব্র আকর্ষণ থেকে এ ধরনের নামকরণ। এ ছাড়াও সমকালিন বিষয়গুলোকে মিথিক ব্যঞ্জনায় কবিতায় উপস্থাপনের অদম্য ইচ্ছা আমার কবিতার অন্তর্গত বিষয়। ‘বাঞ্ছাকল্পতরু’ হল এমন একটি কল্পিত বৃক্ষ যার কাছে যে যা চাইবে তাই পাবে। অর্থাৎ সে সবার বাঞ্ছা পুরণ করে। আমার কবিতার মধ্যে বাংলার বিভিন্ন বিষয়-আশয় ধরার প্রবণতা আপনারা দেখবেন।
ঢা রি: আপনার কবিতাগুলো কি অটোমেটিক পোয়েট্রি না আপনি সচেতনভাবে কোনো থিম নিয়ে কাজ করেছেন?
উত্তর: অটোমেটিক পোয়েট্রি বলতে আমরা কি বুঝব? যে কবিতা কবির মস্তিষ্ক হতে কলমে অটোমেটিক চলে আসে? আসলে অটোমেটিক পোয়েট্রি বলে কিছু কি আছে? কবিতার কবির সচেতনার ফল মাত্র। অটোমেটিক হলেও তা কবির চারপাশের চিন্তা ও চিত্রের সচেতন প্রতিফলন। কবিতায় দর্শন খুব জরুরী। তবে কোণ বিশেষ থিম নিয়ে একটা কবিতার বই করা যায় কি না আমি জানি না। তবে বিভিন্ন থিমের মাঝে একটি দর্শন একটি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। আমার কবিতার বইয়ে আমি বাংলাদেশের আবহমান ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতর মানুষের বিচিত্র চিন্তা ও চেতনার সমন্বয়ের চেষ্টা করেছি মাত্র। লোকজ বিষয়, সংস্কার ও মিথিক অনুষঙ্গ আমাকে প্রাণিত করে। আমার কবিতায়ও তাই আছে।
ঢা রি: কবিতার কি কোনো দায় আছে? থাকলে সেই দায়বোধ কি? কারপ্রতি?
উত্তর: সাহিত্যের অবশ্যই দায় আছে। কবিতারও। এই দায় কবির বেড়ে ওঠা দেশের মানুষের, সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি।
ঢা রি: আপনার এই কবিতার বই পাঠককে কি বলতে চায়?
উত্তর: আমার কবিতার বই পাঠককে কি বলতে চায় পাঠক পড়ে বুঝে নিবে। তবে আমি চেষ্টা করেছি মানুষের সহজিয়া চেতনাকে উস্কে দিতে। কতটুকু পেরেছি পাঠক বলবে।
ঢা রি: কবিতার বই চলে না জাতীয় একটা কথা প্রচলিত আছে। এটা কি ষড়যন্ত্র?না চললে এত বই বের হবে কেন?
উত্তর: কবিতার পাঠক কখনো বেশি ছিল না। মূলত কবিরাই কবিতাকে গুরুত্বের সাথে পাঠ করে। তাই হয়তো কবিতার বই কম চলে। তবে কবিতার বই একদম চলে না তা নয়। ষড়যন্ত্রের বিষয় নয়, হয়তো গল্প, উপন্যাসের চেয়ে কম চলে বলেই এমন কথা প্রচলতি। বই যেমন বের হচ্ছে তেমন বই বিক্রিও হচ্ছে তবে কম আর বেশি।
ঢা রি: আপনার এই বইয়ের কতটুকু প্রচারণা ও বিক্রয় আশা করেন?
উত্তর: বইয়ের প্রচারণা অবশ্যই চাই। তবে আগেই বলেছি কবিতার পাঠক কম। আমার বই এসেছে ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে। দুই দিনে ১০ কপি বিক্রি হয়েছে ‘বাতিঘর’ বই বিপণী হতে। বই বিক্রি হলে ভালো লাগে।
ঢা রি: আপনার পাঠকের জন্য কিছু বলবেন?
উত্তর: পাঠককে বলবো বই কিনুন, পড়ুন।
ঢা রি: বাংলা একাডেমির মেলা ও অন্য কোথায় বইটি পাওয়া যাবে?
উত্তর: বাংলা একাডেমির মেলায় ৫৭৭ নং ‘বেহুলা বাংলা’, বহেরা তলার ‘তৃতীয় চোখ’ ও ‘খড়িমাটির’ স্টলে বইটি পাওয়া যাবে। এছাড়াও চট্টগ্রামের বই বিপণি ‘বাতিঘর’, ‘নন্দন’, ‘গ্রন্থনিলয়’ ও ‘কারেন্ট বুক সেন্টার’ এবং চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত বই মেলায় ‘শাঁখ’ এর স্টলে বইটই পাওয়া যাবে।

শেখর দেবের দশটি কবিতা

বাঞ্চাকল্পতরু

তোমাদের নিঝুম প্রেম থেকে দূরে-
যেখানে নিবিড় আরাম ডাকে প্রাণের মায়ায়
ক্ষণকাল আকাল পেরিয়ে গড়েছি নিয়মের সংসার
ধ্যানের সুরভি মেখে হাঁটি তরুণ তীর্থের পথে
খুঁজে পাই পঞ্চবটির বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা- বিবেকানন্দ প্রেম!
আমি ব্রহ্মচারী নই- শুধু বিবিধ বেদনায় হয়েছি আকুল নরোম
আশ্রমের প্রতিটি দেয়ালে লিখে যাই জীবনের নিবিষ্ট সূত্রমালা
জপমালায় ভরসা নেই- শুধু বিধানের নিয়ম ভেঙে গড়ি বিপুল পৃথিবী।
সূত্রের বিন্যাসে লাগে অসীমের ঢেউ
দুলে ওঠে পাল হয়ে বেসামাল নমিত নৌকায় লাগে দোলা
মানে-অপমানে, শত্রু-মিত্রে, শোকে আর সুখে গুছে যায় ব্যবধান ।

বাঞ্চাকল্পতরু-২

পাহাড়ের আনত বাধা পেরিয়ে মেঘের কাছাকাছি
ওখানে কোন যোগী নেই- মানুষ বড়ো বেশি গৃহস্থ মায়ায়
লুকিয়ে রেখেছে সমূহ সন্ন্যাস আর নিয়মের উপাচার
দেখা হলো এক জোড়া কাঠবিড়ালির সাথে
যারা গত জন্মে সাধুর ভানে নিয়েছিল গৃহস্থ কামনা
এখানে কিছু মেঘের ভাসমান জল ছাড়া কিছু নেই
যারা এসেছে পৌরাণিক প্রতিকের কাছে চন্দ্রনাথ চূড়ায়
তারাও পুণ্যের জলে ডুবে যাবার আগে ভাবে
কোন রত্নাকরের দস্যুপনার কথিত গল্পের ছবি!
পাপ আর পুণ্য কোনটাই টানেনি তেমন
শুধু ডুবে গেছি বিবিধ বৃক্ষের ছোঁয়ায়
অবিন্যস্ত সিঁড়ি-পথের প্রতিটি পাথরের কাছে
রেখে আসি কিছু অব্যক্ত ঘাম আর সুতীব্র নিঃশ্বাস।
শিউলি বিছানো পথের মায়ায় পেয়েছি স্বর্গীয় আমেজ
এসবের মাঝে গড়েছি কামে প্রেমে বাঞ্চাকল্পতরু।

নিখুঁত আঁধার

রাতের নিপুণ আঁধার হাতে
রচনা করেছি কিছু স্বপ্ন আর
প্রার্থিত পরিখা।
সুরের অন্তরে যুদ্ধের মন
প্রাচীন আলোয় মেতে ওঠে
উদাস মুদ্রায় লাগে পুরনো প্রণয়।
তোমার বিছানা করে আকুলি বিকুলি
আসন্ন আগুনে মাতাল পাখি
হঠাৎ ফিরে যায় সুলভ সুন্দরে
যেখানে ছিল অসীম আশ্রয় আর
তরমুজ রাঙা মায়াবী সুখের শরীর।
কপালে নিখুঁত সিঁদুর নিয়ে
রমনের তরে রাধা হয়ে
নিষিদ্ধ ব্যথা আর দিও না বুকে
ছেড়ে দাও তিল তিল পোড়া
আগুনের ফানুস।
হয়তোবা ছাই হয়ে বিরহী রাতে
উড়ে এসে দিয়ে যাবো নিখুঁত আঁধার।

পাপড়ি পাপড়ি

চোখের ভেতর জাগে দুর্বিনীত আলো। চারিদিকে ঘুরি তীব্র মায়ার মাঝে।
গোলাপের ছড়ানো পাপড়ি জোড়া লাগানোর আশায় যতোবার গিয়েছি
তোমার কাছে। বর্ণিল হাসিতে উড়িয়ে দিলে আকাশে। পাপড়ি মানে
জেনেছি বিনিদ্র রজনীর স্বপ্ন। যার রয়েছে দীর্ঘ অনুরাগের গোপন ভাষা।
যে ভাষা আজো দ্বিধায় বলা হয়নি ঠিক চিন্তার অবিকল। একবার সুন্দর
সফেদ গোলাপ তার সব মায়া নিয়ে শিখিয়েছে ভালোবাসার বিন্দু-বিসর্গ।
অপূর্ব ঘোরের মাঝে কেটে গেলে বেলা ভুলে যাই ফুলের অপূর্ব সুরভি।
শুধু সমুদ্র বিশাল। লোনা লোনা খেলা যতো জেগে ওঠে অপার মহিমায় ।
বাঁকে বাঁকে বাজে বাঁশি, সুরের সমাধি। আলো তার প্রকট উজ্জ্বল আশা।
সমুদ্র মন্থনের পর উঠে আসা যতো সুন্দর তার সব নিয়ে গেলে তুমি।
রেখে গেলে শুধু কিছু প্রগাঢ় নীল। সেই নীল পানে নীলকণ্ঠ হয়ে বুঝি
আলোর মাত্রা। যে আলোয় অন্ধ হয়ে মাতাল মত্ততা নিয়ে থাকি ঘোরে।
পৃথিবী অচেনা হয় যদি, তোমারে চিনিতে চিনিতে আবার নীলকণ্ঠ হয়ে
সুরের সিঙ্গায় তুলে আনি সমস্ত গোলাপের পাপড়ি। পাপড়ি পাপড়ি শুধু।
জানো যদি কতো পাপড়িতে হবে এক সুবোধ গোলাপ। বিভেদ ভুলে
একবার বলে যাও হে আলো, তুমি কেন হও কালো বুকের স্নিগ্ধ আবাসে।

শামুক মুখ

এতকাল পরে ভাটির শামুক এক
মৃদু পায়ে চলে চর হতে লোকালয়
শহরে বীর্যের ঘ্রাণমগ্ন পোকাদের ভিড়
পথে পথে পথিক স্বার্থের ধুলোয়
অচেনা সুর নিয়ে চলে যায় একা।
দুধেল শরীর আর বাহারি আমোদ নিয়ে
বেড়ে যায় শামুকের মুখ
জলের স্রোতে টিকে থাকে কংক্রিট দেহ
তীক্ষ্ণ চুম্বন ছুঁয়ে সহসা সমুদ্র যাপন
আর গণহারে মৎস্য সঙ্গম।

জমিনের অন্তর্বাস

জলের কল্লোলে ঘুম ভাঙা রাতের কাছে
রেখেছি আনাড়ি যৌবন
মাটি-জলের তুমুল মিলনে ভাঙে চরের সম্ভ্রম।
আমাদের বেড়া দেয়া সংসারে
ঝিরঝিরে বাতাস আসে
মেঘেদের ডাকে তিরোহিত হয় নদীর শরীর।
খরাক্লান্ত তিস্তায় জাগে শুশুক শিহরণ
আবাদি মনগুলো জলের আশায়
খুলে রাখে অনন্ত অন্তর্বাস
এসবের প্রখর উল্লাসে সেদিন
রমণ জলে ভরেছে সোমত্ত জমিন।

রাতুল প্রহর

বিনিদ্র রজনী আঁকে কামক্লান্ত চোখ
নিখুঁত কালো জমে উজ্জ্বল শিরায়
তারা যদি খসে যায় আপাত নিয়মে
আঁধারে খেলা করে অনন্ত অভিমান।
উড়ে গেছে যে ডাহুক ঝোপের আড়ালে
তার তরে কেবা গায় বিলাপের সুর
জল আছে হাওয়া নাচে হৃদয় ফুলে
খোঁজ করো যতো পারো নতুন আবেগ।
ভোরগুলো তাজা প্রাণে হউক অম্লান
ঝলমল রোদ ওঠে হীরক আমোদ
পেছনের সুর ভুলে সমুখ সমর
তলোয়ার গুনে শুধু রাতুল প্রহর!

সূর্যরাঙা সিঁদুর

মধুর সময় দিয়েছে শিখর মুগ্ধতা। প্রেমাহূত পরশ এতোটা হালকা করে বুঝিনি আগে। ভাসমান বেলুন হয়ে উড়েছি বিবিধ আনন্দে। ফাঁকি দিয়ে গোয়েন্দা চোখ কেড়ে নিতাম তোমার মহাকর্ষ মমতা। মিলনের মৌতাতে নিয়ত পেয়েছি তুলোর স্বভাব। হরণের আকাঙ্ক্ষায় বারবার এসেছো নিবিড় আলিঙ্গনে। একদা সাহসের পরিধী মাপাতে চেয়ে বলেছিলে : পারো কিনা দেখি রাঙাতে সিঁদুর শোভায়! অন্ধ সামাজিক চোখে ব্যর্থ হয়েছে নিবিষ্ট কারুকাজ।
কথা ছিল কপালে সূর্যের অবিকল সিঁদুর মেখে রাঙিয়ে দেবে অমীমাংসিত অনুরাগ। তুলসী গাছ শুকিয়ে পাতায় পুজোর ঘ্রাণ মুছে গেলে তুমি হাতের কররেখা জুড়ে ছড়িয়ে দাও অবিশ্বাস্য ছলনা। আজকাল যে সিঁদুর-সূর্য নিয়ে ঘুরে বেড়াও তাতে আমার কোন অধিকার নেই। আছে শুধু এক বিমুগ্ধ ইতিহাস যা নিয়ত হত্যা করে নিঠুর ছুরিতে আর যমরাজের আদিষ্ট আজ্ঞায় প্রতিবার ফিরে পাই প্রাণ।

ঘুড়ির কথা 

বহুকাল কেটেছে এখানে
হলুদ গোলাপের বাহারি সুখে
ভাসে প্রণয়ক্লান্ত ঠোঁট আর চোখের বাগান
কাজলের গাঢ় দাগে ডুবে যেতে যেতে
প্রশস্ত ললাটে লিখে রাখি বিদায় ভাষ্য।
আরো নিচে
ছুঁয়েছি চপল তিল চুলের গোড়ায়
দিশেহীন ঝিম ধরা চোখে
ঢেউ জাগে জোয়ারের টান
আঙুল শিহরণে সমবেত ঠোঁটে লাগে দোলা।
পথের পাশে জড়িয়ে থাকে পর্বত রাত
চূড়ার মায়ায় তুলি নিবিড় টান
কম্পনের সাম্পানে চড়ে খুলে যায় পাতাল পুরি
তোমার গোয়েন্দা হাত খুঁজে আনে প্রবল নাটাই
ঘুড়ি ওড়ে তুমুল বাতাসে।

ত্রিশের সমান পথ

কালের মহান হাত ধরে চলেছি নিবিড় সবুজ প্রান্তরে
ত্রিশ বছর জুড়ে ভাটির ভুবনে বিনত নরোম বাতাসে
বেলা আর অবেলার সুর ধরে ঘর্মাক্ত গ্রাম থেকে শহরে।
এখানে নগরে বিচিত্র ঋতুর কঠিন ভেলায় ঘুরে ঘুরে
ভুলেছে প্রান্তজন রোদ-পোড়া মাঠ আর ঘুড়ি-ওড়া বিকেল
তারে দেখে মায়া হয় ছায়াহীন অবলা মানুষ অসহায়।
আধেক কাল কেটেছে মুগ্ধতায় মাটিলগ্ন মনের ভেতর
যেখানে অমল ধবল ধেনু আর সহজ মানুষের ভিড়।
দাওয়ায় বসে দেখি রোদ-রাঙা উঠোনে ফোটে বাহারি ফুল
শান বাঁধানো ঘাটের জলে মমতা-ঢেউ এলোমেলো হাওয়া।
গন্ধরাজের বিবিধ মায়ায় হাসে প্রজাপতি ডানা অম্লান
বরষা-বিমুগ্ধ বেলায় সোঁদা গন্ধে দোলে মাতাল মাটিমন।
অতঃপর যান্ত্রিক মানুষের ভিড়ে কেটে যায় বাকিটা বেলা
সময়ের ফাঁদে পড়ে মাথা খোলে বেড়ে ওটি নতুন মানুষ।
কষ্টের কাল আসে কতো বেদনার রঙ নিয়ে বেতাল তানে
বধির ব্যস্ততা ভিড়ে এসেছিল কাছে কেউ মনের তাগিদে।
পেয়েছি নতুন ভাষা তার কাছে জমা রেখে বিবিধ মনন
আপন মনে টেনেছি কাছে যারে বেমালুম চলে গেছে দূরে।
বেলা যায় জীবনের ঢেউ তোলে কিছু তার জানে নাকো কেউ
যান্ত্রিক চমকে হাসে বিস্তর বেলা আর বিষণ্ন বেদনায়।
রুজির বাজি আর হিলিয়াম চাঁদ-রাঙা রাত দিবে কতোটা
আমোদ? যে শিশির চলে গেছে সিঁদুর-সূর্য নিয়ে নিদারুণ
তার তরে চেনা জনপদের ভিড়ে কেন জাগে অচেনা ঢেউ !
শেখর দেব

কবি শেখর দেব এর সাথে কবিতা বিষয়ক আলাপ

http://earthnews24.com/2016/03/37766on:
কবি শেখর দেব
কবি শেখর দেব

কবি কবিতার উঠোনে লেপেন শিউলি ঝরা সকালের মোহনীয় শিশির বিন্দু। যার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে বাড়ন্ত বেলার কোমল সব অনুভূতি। এবং শব্দের ঝংকারে নিজেকে বেঁধে আয়োজন সারেন প্রাত্যহিক কর্মের। যা মেদহীন শব্দের মোহন জালে দোলা দিয়ে যায় পাঠক হৃদয়। শেকড়ের ঘ্রাণ অথবা দেখা-অদেখার হাজারো মিশেলে তৈরী করেন কবিতার শরীর। কবিতা কী এবং কেন কবিতা, এ প্রশ্ন যেমন চিরকাল জর্জরিত তেমনি প্রতিনিয়ত চলছে কবিতা চর্চা। থেমে যাওয়া কিংবা থেমে গেছে এ নিয়ে অনেককাল আগ থেকেও নানারকম জিজ্ঞাসা প্রতিনিয়ত উঁকি দিচ্ছে আমাদের মাঝে। একজন কবি চোখের দেখা ঘ্রাণ নিয়ে পথ চলে অবিরাম যার নাড়িভূড়ি ঘেটে ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরী করেন নানান সব  শব্দের জাদুকরি মুগ্ধতা। কবির চিন্তনের সীমারেখা বেশ সুন্দর ও সাবলীল যার রেশে হেঁটে পার করা যায় বেশ সময়।  কবি শেখর দেব তেমনি একজন কবি। কবির রয়েছে ২টি কবিতাগ্রন্থ প্রত্নচর্চার পাঠশালা (২০১৪) ও বাঞ্ছাকল্পতরু (২০১৬)। এবং বর্তমানে ‘সবুজ আড্ডায়’ ও ‘শাঁখ’ লিটল ম্যাগ সম্পদনার সাথে যুক্ত।  কবিতা বিষয়ক কিছু প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আর্থনিউজ২৪ এর সাথে কথা বলেছেন  কবি শেখর দেব 

আর্থনিউজ২৪ :  কেন কবিতা লিখেন?
শেখর : লেখার তাগিদ কাজ করে মনের ভেতর। এই তাগিদ হতে কবিতার শরীর দাঁড়িয়ে যায় কারণ কবিতায় তা প্রকাশ করতে পারি সবচেয়ে বেশি, অন্যান্য সাহিত্য মাধ্যমের চেয়ে। 
আর্থনিউজ২৪ : কবিতা কী সবার জন্য, যদি সবার জন্য না হয়, তাহলে সবার জন্য নয় কেন?
শেখর : সাহিত্য সবার জন্য। ঠিক কবিতাও। তবে কবিতা সাহিত্যের উচ্চ মার্গীয় শিল্প মাধ্যম বলে সবাই কবিতার সাথে কমিউনিকেট করতে পারে না। তাই কবিতা শেষ পর্যন্ত সবার হতে পারে না। কমিউনিকেট করতে না পারাটা মূলত কবিতার সীমাবদ্ধতার চেয়ে পাঠকের সীমাবদ্ধতাই বেশি। কবিতার পাঠক কখনো বেশি ছিল না। জ্ঞানের উচ্চতম ও নন্দনের শুদ্ধতম প্রকাশে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে না। 
shekhor-2আর্থনিউজ২৪ : সাম্প্রতিক কবিতার যে  দুর্বোধ্যতা এই বিষয়কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শেখর : সাম্প্রতিক সময়ে কবিতা দুর্বেধ্য এমনটা নয়। কখনো কবিতা সুবেধ্য ছিল না। কবিতা মানুষের ভাবনাকে উস্কে দেয়। ভাবনার ভুবনে ডুবাতে চায়। যারা এই ভুবনে ডুবতে নারাজ তারাই কবিতা দুর্ভেদ্য বলে। তবে বর্তমান সময়ে কিছু কিছু কবিরা কবিতাকে কবিতা করার অপারগতার কারণে দুর্ভেদ্য করে তুলছেন। এ দায় কবিদের।
আর্থনিউজ২৪ : সাম্প্রতিক তরুণ কবি ও অগ্রজ কবিদের মধ্যে কি রকম কবিতা-পার্থক্য লক্ষ্য করেন?
শেখর : প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে কবিতার ভাষা বা বয়ান ভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অগ্রজ কবিরা যেভাবে বলে এসেছেন তরুণ কবিরা চায় অন্যভাবে বলতে। অন্যভাবে নিজেকে দাঁড় করাতে। এ জন্য কবিতায় বিষয়, শব্দ ব্যবহারগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আর্থনিউজ২৪ : বর্তমানে যে গদ্যকবিতা লিখা হয়, এ বিষয়কে আপনি কিভাবে দেখছেন?
শেখর : গদ্য কবিতা অনেক আগে থেকে লেখা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা” কাব্যটি গদ্যে লেখা। কবিতা প্রকাশের ভিন্নতার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফর্ম তৈরি হয়। প্রচলিত ছন্দের বাইরে এসে গদ্যে কবিতা লেখার জন্য কবিতার বিভিন্ন বিষয় (ব্যকরণগত, প্রকাশগত) ভালো করে রপ্ত থাকা চাই। গদ্য কবিতাকে ছন্দহীন মনে করা উচিত নয়। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ সুন্দর বলেছিলেন, “নৃত্যরত রমণী ছন্দ আর হেঁটে যাওয়া রমনীর ছন্দ আলাদা” তাই ছন্দহীন কবিতা হয় না। গদ্য কবিতার ছন্দ সেই হেঁটে যাওয়া রমণীর ছন্দের মতো।
আর্থনিউজ২৪ : কবির ক্ষেত্রে কখন কবিতার বই করার উত্তম বলে মনে করেন?
শেখর : যখন কবি মনে করেন তাঁর কবিতার বই করা উচিত।
আর্থনিউজ২৪ : সাম্প্রতিক কবিতা সম্পর্কে কিছু বলুন।
শেখর : সাম্প্রতিক কবিতা বলতে কি এই সময়ে লেখা কবিতাকে বোঝানো হয়েছে? যদি তাই হয়, তাইলে বলতে হয় সাম্প্রতিক কবিতা বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আর্থনিউজ২৪ : কবিতায় যে উত্তর-আধুনিক ফর্ম, এই বিষয়কে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শেখর : উওর আধুনিকতা হলো কবিতা বিষয়ক চিন্তা ও চেতনা, কবিতার দর্শনও বলা চলে। এটা কোন ফর্ম না হলেও উত্তর আধুনিক কবিতার একটি ফর্ম আপাত দাঁড়িয়ে গেছে বলে আমার ধারনা। বিষয়গত দিক হতে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মাটিলগ্ন মানুষের সুর, লোকাচার, মিথ, পুরাণ ও ছন্দগত দিক হতে প্রচলিত ছন্দ হতে বেরিয়ে এসে কথন স্পন্দের প্রতি জোর কবিতাকে একটি ফর্ম দিয়েছে বৈকি।
আর্থনিউজ২৪ : ভবিষ্যতে কবিতার ট্রেন্ড কোন দিকে যেতে পারে বলে মনে করেন?
শেখর : কবিতা বহতা নদীর মতো তাঁর পথ বেছে নিবে। মানুষের আচার, সংস্কৃতি এসবের পরিবর্তনের সাথে সাথে কবিতাও পরিবর্তিত হবে।
আর্থনিউজ২৪ : বর্তমান সময়ে কার কার কবিতা আপনার ভালো লাগে?
শেখর : বর্তমান সময়ে অনেকের কবিতা ভালো লাগে। সবার সব কবিতা হয়তো ভালো লাগে না তবে অনেকের কবিতায় চমক আমাকে মুগ্ধ করে।